বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান পুষ্টিগত সমস্যা হলো আয়রনের অভাব, যা বিশ্বব্যাপী মানুষের শারীরিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদী সুস্বাস্থ্যের পথে এক বড় অন্তরায়।
বিশেষজ্ঞরা একমত যে এটি একটি গুরুতর সমস্যা হলেও, কখন এই ঘাটতি প্রকট হয়ে ওঠে এবং এর সর্বোত্তম চিকিৎসা পদ্ধতি কী হওয়া উচিত—তা নিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতভেদ রয়েছে। সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে আয়রন ঘাটতির প্রভাব ও সাপ্লিমেন্ট ব্যবহারের কার্যকারিতা নিয়ে নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন আয়রনের ঘাটতিতে ভুগছেন, যার শিকার মূলত শিশু ও প্রজননক্ষম নারীরা। বিশেষ করে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে আয়রনের অভাব অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি কম ওজনের শিশুর জন্ম বা প্রিম্যাচিউর ডেলিভারির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি কেবল শারীরিক বৃদ্ধিই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে আচরণগত সমস্যা, সামাজিকতা ও মোটর স্কিল বিকাশেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, শরীরে আয়রন কমে গেলে রক্তকণিকা তৈরির প্রক্রিয়া বদলে যায়, যা কোষে অক্সিজেন সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটায় এবং মারাত্মক ক্লান্তি সৃষ্টি করে।
নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের কারণে রক্তক্ষয় এবং গর্ভাবস্থায় বাড়তি চাহিদা এই ঘাটতির প্রধান কারণ। এছাড়া নিরামিষভোজী, ক্রীড়াবিদ ও নিয়মিত রক্তদানকারীদের মধ্যেও এর ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও প্রকট, কারণ তাদের দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধির জন্য প্রচুর আয়রনের প্রয়োজন হয়।
তবে বিতর্ক শুরু হয়েছে আয়রন সাপ্লিমেন্ট বা সম্পূরক ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের শরীরে আয়রনের অভাবজনিত ক্লান্তি বা উপসর্গ স্পষ্ট, তাদের জন্য সাপ্লিমেন্ট কার্যকর। কিন্তু যাদের শরীরে কোনো বিশেষ উপসর্গ নেই, তাদের ক্ষেত্রে কৃত্রিম আয়রন গ্রহণ তেমন কোনো বাড়তি সুবিধা দেয় না।
শিশুদের সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীরা দ্বিধাবিভক্ত।
অনেক বিশেষজ্ঞ শিশুদের চার মাস বয়স থেকে আয়রন ড্রপ দেওয়ার পরামর্শ দিলেও কিছু গবেষণায় ভিন্ন ফলাফল দেখা গেছে।
দেখা গেছে, অপ্রয়োজনীয় আয়রন সাপ্লিমেন্ট অনেক সময় শিশুদের ওজন বৃদ্ধি এবং মানসিক বিকাশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি উচ্চ মাত্রার আয়রন গ্রহণকারী শিশুরা কিছু বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষায় অন্যদের তুলনায় কম নম্বর পেয়েছে বলেও প্রমাণ মিলেছে। এই জটিলতার কারণে আয়রন ঘাটতি প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য বিজ্ঞানীরা এখনও কোনো একক ও সর্বজনীন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি।
তবে বিশেষজ্ঞরা পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস এবং ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
আরটিভি/এএইচ




